রহিম মিয়ার গাভী ক্রয়

ঘটনা প্রবাহ-১(ক):

অস্বচ্ছল রহিম মিয়া ভাবছে, একটা ফ্রিজিয়ান দুধেল গাভী কিনতে পারলে দ্রুত তার সংসারে স্বচ্ছলতা আসত। কিন্তু কে দেবে তাকে এক লক্ষ টাকা গাভী কেনার জন্য? ঘটনাচক্রে করিম মিয়ার সাথে পরিচয় ও সখ্য গড়ে ওঠে। রহিম মিয়ার কথা শুনে সে বলে, মেয়ের বিয়ের জন্য এক লক্ষ টাকা সঞ্চয় করেছি। তুমি যদি এক বছরের মধ্যে টাকাটা ফেরৎ দিতে পারো তাহলে আমি তোমাকে গাভী কেনার জন্য এক লক্ষ টাকা দিতে পারি এজন্য আমাকে কোন প্রকার লাভ/মুনাফা দিতে হবে না। রহিম মিয়া খুশিতে গদগদ হয়ে বলে, দুধেল গাভী কিনে আমি দুধ বিক্রি করে এক বছরের মধ্যেই টাকাটা ফেরৎ দিতে পারবো। অবশেষে রহিম মিয়া করিম মিয়ার নিকট থেকে এক লক্ষ টাকা ধার নিয়ে একটি ফ্রিজিয়ান দুধেল গাভী কিনল। প্রতিদিন দুধ বিক্রি করে বেশ ভালই আয় হচ্ছিল কিন্তু বিধি বাম। ২/৩ মাস যেতে না যেতেই হঠাৎই গাভীটি মারা যায়।

জিজ্ঞাসাঃ

১. অস্বচ্ছল রহিম মিয়া স্বচ্ছলতার আশায় দুধেল গাভী কিনেছিল। কিন্তু টাকা ধার করে কেনা গাভীটি হঠাৎ মারা যাওয়ায় তার মাথায় বাজ পড়ল। এখন কিভাবে সে করিমের নিকট থেকে ধারে নেয়া এক লক্ষ টাকা পরিশোধ করবে?

২. করিম মিয়া ততটা স্বচ্ছল নয় যে, রহিম মিয়ার দুঃখ বিবেচনা করে সে টাকাটা মাফ করে দেবে। আর স্বচ্ছল হলেও তিনি কেনই বা ধার দেয়া টাকা মাফ করে দেবেন?

৩. করিম মিয়া তার মেয়ের বিয়ের জন্য জমানো টাকা ধার দিয়েছে, এখন টাকা ফেরৎ না পেলে তিনি কীভাবে তার মেয়ের বিয়ে পার করবেন?

৪. এই পরিস্থিতি রহিম মিয়াকে করেছে নিঃস্ব আর করিম মিয়ার সুখী জীবনে এনেছে একটা চিন্তার ঝড়, এটা কি কোন স্বাভাবিক বিষয়?

ঘটনা প্রবাহ-১(খ):

অস্বচ্ছল রহিম মিয়া তার বন্ধু করিম মিয়ার কাছ থেকে এক লক্ষ ধার নিয়ে একটা ফ্রিজিয়ান দুধেল গাভী কিনতে চায়। দুই বন্ধুর বড়ীর দূরত্ব প্রায় ১০ কি. মি.। করিম বলে, তোমাকে আমি গাভী কেনার জন্য এক লক্ষ টাকা ধার দিতে পারি এক শর্তে, টাকার জন্য আমাকে কোন লাভ দিতে হবে না। তবে তুমি যেহেতু আমার টাকায় দুধেল গাভী কিনবে তাই গাভী থেকে প্রাপ্য দুধের অর্ধেকটা প্রতিদিন আমার বাড়ীতে পৌঁছে দিতে হবে। আর গাভী দুধ দেয়া বন্ধ করার পর অনুর্দ্ধ এক মাসের মধ্যে আমার দেয়া টাকাটা ফেরৎ দিতে হবে।

জিজ্ঞাসাঃ

  1. প্রতিদিন ১০ কি. মি. পথ যাতায়াত করে দুধ পৌঁছে দেয়ার শর্তে করিমের কাছ থেকে টাকা নিয়ে গাভী কেনা সত্যিই কি রহিমের জন্য সহজ/লাভজনক?
  2. গাভী দুধ দেয়া বন্ধ করলে করিমের টাকা ফেরৎ দেয়ার জন্য পুনরায় গাভীটি বিক্রি করতে হবে তাহলে করিমের কাছ থেকে লাভবিহীন টাকা নিয়ে গাভী ক্রয় দ্বারা আদৌ কি রহিমের স্বচ্ছলতা আসা সম্ভব?

ঘটনা প্রবাহ-১(গ):

অস্বচ্ছল রহিম মিয়া গ্রামের একটি প্রতিষ্ঠান থেকে লাভ-লোকসানের ভিত্তিতে এক লক্ষ টাকা ঋণ নিয়ে একটি ফ্রিজিয়ান দুধেল গাভী কিনল। শর্ত গাভীটি প্রতিদিন যে পরিমাণ দুধ দেবে তা বিক্রি করে গাভী লালন-পালনের খরচ বাদ দিয়ে অবশিষ্ট্য মুনাফা সমান দুই ভাগে ভাগ করতে হবে। গাভীটি দুধ দেয়া বন্ধ করলে ঋণদানকারী প্রতিষ্ঠান গাভীটি নিয়ে নেবেন কারণ ওটা প্রতিষ্ঠানের টাকায় কেনা। অবশ্য গাভীটি কোন সময় কোন কারণে মারা গেলে রহিম মিয়াকে গাভী কেনার জন্য গৃহীত টাকার অর্ধেক ফেরৎ প্রদান করতে হবে। রহিম মিয়া দীর্ঘদিন ধরেই গাভী পালন করে স্বচ্ছলতার স্বপ্ন দেখছেন। কিন্ত এমন শর্তে টাকা নিয়ে গাভী কিনলে কোনদিনই তিনি গাভীর মালিক হতে পারবেন না। সুতরাং স্বচ্ছলতা আসার কোন প্রশ্নই আসে না। তাই রহিম মিয়া নানা ভাবনায় দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে গেলেন।

জিজ্ঞাসাঃ

  1. ঋণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের লাভ-লোকসানের ভিত্তিতে পরিচালিত সুদিবিহীন কার্যক্রম সত্যিই কি রহিম মিয়ার জন্য একটা ভাল সুযোগ?
  2. যদি গাভীটি মারা যায় তাহলে তাকে গাভী কেনার জন্য গৃহীত টাকার অর্ধেক ফেরৎ দিতে হবে, কোথা থেকে দেবেন সে টাকা?
  3. গাভীটি বেঁচে থেকে দুধ দেয়া বন্ধ করার পর গাভীটি ঋণদানকারী প্রতিষ্ঠানের হবে কারণ ওটা কেনার জন্য পুরো টাকা দিয়েছে ঋণদানকারী প্রতিষ্ঠান, রহিম মিয়া কোন টাকা বহন করেনি। অর্থাৎ এই পদ্ধতিতে রহিমের স্বচ্ছলতা আসবে না, কোনদিন একটা গাভীরও মালিক হতে পারবেন না। উপরন্ত গাভীটি মারা গেলে গাভীর অর্ধেক টাকা ফেরৎ দিতে গিয়ে তাকে আরও নিঃস্ব হতে হবে। তাহলে এই পদ্ধতি কীভাবে রহিম মিয়ার জন্য একটা সুযোগ হতে পারে?

ঘটনা প্রবাহ-১(ঘ):

অস্বচ্ছল রহিম মিয়া ঋণ নিয়ে একটি ফ্রিজিয়ান দুধেল গাভী কেনার জন্য বাড়ী থেকে ২০ কি. মি. দূরে অবস্থিত একটি অর্থলগ্নীকারী প্রতিষ্ঠানে যায়। কারণ, সে শুনেছে ঐ প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিলে ঋণের জন্য কোন অতিরিক্ত টাকা দিতে হয়না, যে টাকা ঋণ দেয়া হয় সেই টাকাই কিস্তির মাধ্যমে পরিশোধ করতে হয়। ঋণ অফিসে গিয়ে সে জানতে পারে, এক লক্ষ টাকা ঋণ নিলে তাকে প্রতিদিন ২০০ টাকা হিসেবে কিস্তির মাধ্যমে পরিশোধ করতে হবে। রহিম মিয়া গদগদ হয়ে বলে প্রতিদিন দুধ বিক্রি করে আমার পকেটে কমপক্ষে ৫০০ টাকা ঢুকবে, ২০০ টাকা কিস্তি দেয়া আমার জন্য ব্যাপারই না। ঋণ কর্মকর্তা বরলেন, তা ঠিক কিন্তু এই কিস্তির টাকাটা আপনাকে প্রতিদিন সন্ধ্যার মধ্যেই অফিসে এসে জমা দিতে হবে। একথা শুনে রহিম মিয়া আৎকে উঠল, কীভাবে সম্ভব? প্রতিদিন ২০০ টাকা হিসেবে কিস্তি প্রদান করলে পুরো টাকা পরিশোধ হতে তার সময় লাগবে (১০০০০০÷২০০) = ৫০০ দিন আর প্রতিদিন অফিসে গিয়ে কিস্তির টাকা জমা করতে হলে তাকে প্রতিদিন যাতায়াত বাবদ কমপক্ষে ১০০ টাকা মানে ৫০০ দিনে তার খরচ হবে (৫০০×১০০) = ৫০০০০ টাকা। আর তাছাড়া প্রতিদিন কিস্তির টাকা দিতে যাওয়া মানে পুরো দিনটাই তার মাটি; গাভীর পরিচর্যা করবে কখন, আর সংসারের অন্যান্য কাজই বা করবে কখন? ভাবছে বিনা লাভে টাকা নিয়ে প্রতিদিন ২০ কি. মি. যাতায়াত করে কিস্তির টাকা প্রদান করার চেয়ে বরং সুদের উপর টাকা নিয়ে গাভী কেনাই সুবিধাজনক হবে। তা না হলে গাভী কেনার চিন্তাটাই তাকে পরিত্যাগ করতে হবে।

জিজ্ঞাসাঃ

  1. রহিম মিয়ার বিনা লাভে ঋণ নেয়াটাকে আপনি কীভাবে দেখেন?
  2. আপনি কি মনে করেন, প্রতিষ্ঠানটি বিনা লাভে ঋণ দিয়ে বেশ ভাল কাজ করেছে, তবে ঋণের কিস্তি পৌঁছে দেয়াটা মোটেও ভাল নয়। আর সেক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটির কী দায় আছে, একবারে মোটাদাগে বিনে লাভে টাকা দিয়ে তা আবার কিস্তির মাধ্যমে নিজ খরচে আদায় করতে হবে?

ঘটনা প্রবাহ-১(ঙ):

অস্বচ্ছল রহিম মিয়া নিকটস্থ কোন সমিতি/এনজিও/ব্যাংক বা অন্যকোন অর্থলগ্নীকারী প্রতিষ্ঠান এক লক্ষ টাকা ঋণ নিয়ে একটি ফ্রিজিয়ান দুধেল গাভী কিনল। গাভীটি প্রতিদিন যে পরিমাণ দুধ দেয় তা বিক্রি করে রহিম মিয়া খুব সহজেই ঋণের কিস্তির টাকা পরিশোধ করতে পারছেন। নিয়মিত কিস্তির টাকা প্রদান করলে এক বছরেই ঋণের পুরো টাকা পরিশোধ হবে। অর্থাৎ সে নিজে গাভীটির মালিক হবে এবং চেষ্টা থাকলে এবং ভাগ্য সুপ্রশন্ন হলে রহিম ঐ এক গাভী থেকে বহু গাভীর মালিক হতে পারেন।

জিজ্ঞাসাঃ

  1. আপনি কি মনে করেন ঋণদানকারী ঋণ দিয়ে রহিমকে গাভী কেনার সুযোগ দিয়ে ভাল কাজ করেছে তবে ঋণ হিসেবে যে পরিমাণ টাকা তারা দিয়েছে সেটাই ফেরৎ নেয়া উচিৎ তার বেশী নয়? আর যদি অতিরিক্ত নেয়াটা স্বাভাবিক হয় তবে তার পরিমাণ কত এবং কিভাবে তা নির্ধারিত হবে?
  2. যদি কাউকে ঋণ দিয়ে কেবল আসল টাকাই ফেরৎ নেয়া হয় তাহলে কিস্তিতে কেন নেবে? আর কিস্তিতে পরিশোধ করার সুযোগ না থাকলে রহিম মিয়া কীভাবে এক লক্ষ টাকা ফেরৎ দেবেন? এছাড়াও কিস্তি আদায়কারীর বেতন, অফিস ম্যানেজমেন্ট ও অন্যান্য খরচ কীভাবে মেটাবেন?

ঘটনা প্রবাহ-১(চ):

অস্বচ্ছল রহিম মিয়া ঋণ নিয়ে একটি ফ্রিজিয়ান দুধেল গাভী কেনার জন্য একটি অর্থলগ্নীকারী প্রতিষ্ঠানে যায়। ঋণ অফিসে গিয়ে সে জানতে পারে, ঋণের জন্য কোন সুদ বা কিস্তি দিতে হবে না। তবে গাভী কেনার পর প্রতিদিন গাভীর দুধ বিক্রি করে যে আয় হবে তার ৫০% অর্থলগ্নীকারী প্রতিষ্ঠানের নামে জমা করতে হবে। এক বছরে দুধ বিক্রি করে লভ্যাংশ জমা করে যদি তা গৃহীত মূলধনের থেকে অন্তত: ১০% বেশী হয় তাহলে তাকে আর গৃহীত মূলধন ফেরৎ দিতে হবে না এবং ক্রয়কৃত গাভীটিরও সে মালিক হয়ে যাবে। আর যদি জমানো লভ্যাংশ গৃহীত মূলধনের থেকে কম হয় তাহলে গৃহীত মুলধনের সাথে ১০% যোগ করে জমাকৃত লভ্যাংশের সাথে ভর্তুকি দিয়ে ঋণ সমন্বয় করতে হবে। অন্যদিকে যদি গাভীটি ঐ সময়ের মধ্যে মারা যায় তাহলে রহিম মিয়াকে (১) গৃহীত মুলধনের সাথে ১০% যোগ করে জমাকৃত লভ্যাংশের সাথে ভর্তুকি দিয়ে ঋণ সমন্বয় করতে হবে। অথবা, (২) জমাকৃত লভ্যাংশ সহ গৃহীত মূলধনের ৫০% পরিশোধ করতে হবে।

জিজ্ঞাসাঃ

  1. রহিমের গাভী ক্রয়কে অংশীদারী কারবার হিসেবে ধরা হলে জমাকৃত লভ্যাংশ সহ গৃহীত সম্পূর্ণ টাকাই ফেরৎ দেয়ার কথা। এক্ষেত্রে জমানো লভ্যাংশ দ্বারা কিংবা সামান্য ভর্তুকি দিয়ে ১০% অতিরিক্ত সহ গৃহীত ঋণ সমন্বয় করাটাকে আপনি কীভাবে দেখেন?
  2. গাভীটি মারা গেলে রহিম মিয়ার জন্য (১) ও (২) অপশনের কোনটি অধিকতর গ্রহণযোগ্য বলে আপনি মনে করেন এবং কেন?
  3. আপনার মতে রহিমের গাভী কেনার জন্য আরো কোন বিকল্প পদ্ধতি আছে কি যা উপরোক্ত অর্থলগ্নীকারী প্রতিষ্ঠান কর্তৃক আরোপিত শর্তের থেকেও উত্তম এবং যাতে ঋণ গ্রহীতা ও ঋণ দাতা উভয়েই উপকৃত হবে?
  • পাঠকের কাছে যুক্তি ভিত্তিক/ইসলামী শরীয়া ভিত্তিক জবাব/মতামত চাই।

ফুলবাড়ীতে দাদন ব্যবসায়ীদের অত্যাচারে ২৫ জন বাড়িছাড়া

‘মোহাম্মদ আলী (দাদন ব্যবসায়ী) মাঝেমধ্যে বাড়িতে এসে ভয় দেখায়; বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে বলে, ঘরের টিন ও গরু নিয়ে যেতে চায়। খারাপ কথা বলে। তার ভয়ে স্বামী ঘরছাড়া হয়েছে। দুই সন্তান নিয়ে অর্ধাহারে থাকতে হয়। স্বামীর খোঁজও পাচ্ছি না।’ কথাগুলো বলছিলেন দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলার আলাদীপুর ইউনিয়নের বারাই পশ্চিমপাড়া গ্রামের আবদুল হকের স্ত্রী আফতারুন খাতুন। শুধু আবদুল হকই নন, দাদন ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে তা পরিশোধ করতে না পেরে বাড়িছাড়া হয়েছেন এই ইউনিয়নের তিন-চারটি গ্রামের অন্তত ২৫ ব্যক্তি। দাদন ব্যবসায়ীদের অত্যাচারে টিকতে না পেরে তাঁরা বাড়ি ছেড়েছেন। সরেজমিনে ঘুরে এলাকাবাসী ও ভুক্তভোগীদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
জানা গেছে, বারাই পশ্চিমপাড়া গ্রামের আবদুল হক ওই এলাকার হঠাৎপাড়া গ্রামের মোহাম্মদ আলীর কাছ থেকে সাড়ে তিন বছর আগে চড়া সুদে ২০ হাজার টাকা দাদন নেন। টাকা পরিশোধ করতে না পেরে তিন বছর আগে তিনি পালিয়ে যান। আবদুল হকের বাবা শরফুদ্দিন আলী (৭০) বলেন, ‘মোহাম্মদ আলী ১৬ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় বারাইহাট বাজারে আমার ছেলের কাছে পাওনা টাকা আমার কাছে দাবি করে। দুই-এক কথা বলতেই সে পায়ের জুতা খুলে আমাকে মারে। এ ঘটনার প্রতিবাদে স্থানীয় লোকজন বারাইহাট বাজারে ১৭ অক্টোবর অর্ধদিবস হরতাল ও বিক্ষোভ করেন।’
বারাইহাট বাজারের বাসিন্দা মজিবর রহমান, মোহাম্মদ আলী, কেদার মেম্বার ও নকুল চন্দ্র বলেন, সুদখোরদের দাপটে এলাকার নিরীহ মানুষজন দিশেহারা। সুদের টাকা দিতে গিয়ে অনেকে সর্বস্বান্ত হচ্ছেন। সুদখোরদের দাপটে এলাকার প্রায় ২৫ ব্যক্তি বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়ে গেছেন।
এলাকাবাসী জানান, মোহাম্মদ আলী, লাল্টু, মোফাজ্জল, আনারুল (ভুট্টু), সেকেন্দার, রজব আলী, চন্দন চৌধুরীসহ একটি চক্র উপজেলার আলাদীপুর ইউনিয়নের বারাইহাট ও পার্শ্ববর্তী কালিরহাট এলাকায় চড়া সুদের দাদন ব্যবসা গড়ে তুলেছে।
আলাদীপুর ইউনিয়নের কাশিনাথপুরের আদিবাসী বুদু মুরমু বলেন, সেকেন্দারের কাছ থেকে ৫০০ টাকা দাদন নিয়ে এক বছরে সাত হাজার টাকা দিতে হয়েছে। সময়মতো টাকা দিতে না পারায় মারধরও করা হয়েছে। একই গ্রামের হরিলাল হাসদা জানান, মোহাম্মদ আলীর কাছ থেকে টাকা নিয়ে সময়মতো দিতে না পারায় ১৬ অক্টোবর বাজারের মধ্যে তিনি তাঁকে বেদম মারধর করেছেন।
সোম হাসদা (৮০) বলেন, তাঁর ছেলে কমল হাসদা মোহাম্মদ ও মোফাজ্জলের কাছ থেকে টাকা দাদন নিয়েছিলেন। টাকা দিতে না পারায় তাঁরা কমলকে মারধর করেছেন। পরে তিনি ভয়ে পালিয়ে গেছেন। এ ছাড়া বারাই পশ্চিমপাড়া গ্রামের ছাইদুল, মজিদ ও আনোয়ার; হঠাৎপাড়া গ্রামের সহিদুল, মোসলেম ও দুলু; চেয়ারম্যানপাড়ার পাতারু, মোস্তাকিম, আমিনুল হক ও জিয়ারুল এবং বারাই গ্রামের প্রমোদ চন্দ্রসহ সব মিলিয়ে প্রায় ২৫ জন এলাকা ছেড়ে পালিয়ে গেছেন। তাঁদের মধ্যে বেশির ভাগই পরিবার নিয়ে পালিয়ে গেছেন।
গত বুধবার দুপুরে উল্লিখিত দাদন ব্যবসায়ীদের প্রত্যেকের বাড়িতে গেলে শুধু সেকেন্দার আলীকে পাওয়া যায়। তিনি দাবি করেন, মানুষের উপকারের জন্য এ ব্যবসা করেন। পাওনা টাকার জন্য নির্যাতনের অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেন। মোহাম্মদ আলীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। মোহাম্মদ আলীর স্ত্রী মোসলেমা বলেন, তাঁর স্বামীর দাদন ব্যবসা এবং দাদনের টাকা আদায়ের জন্য নির্যাতনের বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না। মোফাজ্জলের স্ত্রী শাহানাজ খাতুনের দাবি, তাঁর স্বামী দাদনের ব্যবসা করেন না। ভুট্টুর বাবা ইসমাইল হোসেন (৮২) বলেন, ‘ছেলেকে অনেক নিষেধ করেছি; শোনে না। মানুষের পাল্লায় পড়ে সে সুদের ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েছে।’
আলাদীপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোজাফফর হোসেন বলেন, বারাইহাট এলাকায় দাদন ব্যবসায়ীদের একটি চক্র গড়ে উঠেছে। তাদের অত্যাচারে তিনজন আদিবাসী গ্রাম ছেড়েছেন। দাদন ব্যবসায়ীদের ভয়ে আরও বেশ কিছু লোক এলাকা ছেড়ে পালিয়ে গেছেন বলে তিনি শুনেছেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা প্রতাপ চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, দাদন দেওয়া-নেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো বাধা নেই। তবে দাদন ব্যবসায়ীদের অত্যাচার-নির্যাতনের বিষয়টি তাঁর জানা নেই। এ ব্যাপারে কেউ অভিযোগ করলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

 সূত্রঃ প্রথম আলো, প্রকাশঃ ২৫-১০-২০১০

এক মাসের কথা বলে টাকা নিয়ে দুই বছর পার!

সুদের গ্যারাকলঃ কেস স্ট্যাডি-তিন

সময়টা ২০১৮ সালের জানুয়ারী মাস। ‘মিঃ খ’ এর অনুরোধে ‘ক’ ‘মিঃ গ’ এর নিকট থেকে ৪০০০০/- টাকা ধার নিয়ে দেন। কথা ছিল এক মাসের মধ্যেই টাকাটা ফেরৎ দেবেন। কিন্তু বেশ কয়েক মাস সুদ টানার পর ‘ক’ ‘খ’ কে বলে, আপনি এক মাসের জন্য টাকা নিয়ে সুদ দিয়েই চলেছেন, ব্যাপারটা কী? জবাবে ‘খ’ বলে, আমি টাকা পেয়েছিলাম, সে টাকা আমি অন্য একজনকে দিয়েছি, কারণ ওখানে লাভ(সুদ) বেশী দিতে হতো। একথা শুনে ‘ক’ এর মাথা নষ্ট, বলে কী ব্যাটা, সেতো নিজেই চড়া সুদে টাকা এনে দিয়েছে ‘খ’ কিনা তার চেয়েও বেশী সুদে টাকা নিয়ে থাকে। ৮/৯ মাস সুদ দেয়ার পর ‘খ’ সুদের টাকা দিতে যথেষ্ট গড়িমসি করতে লাগল। একসময় ‘গ’ নিজে ‘খ’ এর কাছে টাকা ফেরৎ দেয়ার জন্য চাপ প্রয়োগ করে। ‘খ’ টাকা ফেরৎ দেয়ার জন্য আরও ২ মাস সময় চায়। পাঠক বুঝতেই পারছেন, আরও ২ মাস সময় মানেই পুরো ১ বছর বা তারও বেশী। হিসেব করে দেখা গেল যে টাকা ‘খ’ নিয়েছে তার থেকে বেশী সে সুদ হিসেবে পরিশোধ করেছে। শেষ পর্যন্ত একজনের কাছ থেকে গৃহীত টাকা পরিশোধ করার জন্য তাকে আর একজনের কাছ থেকে সুদের উপর টাকা নিতে হচ্ছে। অর্থাৎ যারা একবার সুদের উপর টাকা নেয় তাদের পক্ষে ঐ সুদের গ্যারাকল থেকে বের হওয়াটা সত্যিই কঠিন। যারা ঐ গ্যারাকল থেকে বের হতে পারে তারা বেঁচে যায়, যারা পারে না, তারা বছরের পর বছর সুদ টানতে টানতে অবশেষে হয়ে যায় সর্বস্বান্ত।

টীকাঃ- একবার সুদের গ্যারাকলে পড়লে তা থেকে বের হওয়া সহজ নয়। কাজেই কষ্ট যতই কঠিন হোক না কেন, সুদের গ্যারাকলে পা না দেয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।

সুদের টাকা টাকা পরিশোধ না করায় জেলহাজত!

সুদের গ্যারাকলঃ কেস স্ট্যাডি-দুই

সময়টা ২০১৬ সাল। ‘মিঃ খ’ সুদের উপর ‘ক’ এর নিকট থেকে ৫০০০০/- টাকা নেন। এজন্য ‘খ’ কে প্রতিমাসে প্রতি হাজার টাকার জন্য ১৫০/- টাকা অর্থাৎ ৫০০০০/- টাকার জন্য তাকে প্রতিমাসে ৭৫০০/- টাকা সুদ দিতে হতো। এমনিভাবে সুদ ‍দিতে দিতে ‘খ’ লক্ষাধিক টাকা পরিশোধ করে একসময় মাসিক সুদের টাকা দেয়া বন্ধ করে দিয়ে ‘ক’ এর কাছ থেকে নিজেকে আড়াল করার চেষ্টা করতে থাকে। এদিকে ‘ক’ বিষয়টি বুঝতে পেরে ‘খ’ কে দেয়া ৫০০০০/- টাকা ফেরৎ পাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। এক সময় সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়ে গেলে সে প্রদত্ত টাকার বিপরীতে বন্ধক হিসেবে গৃহীত চেক ব্যাংক থেকে ডিজঅনার করিয়ে নিয়ে থানায় মামলা দায়ের করে। কথায় বলে, বাঘে ছু’লে এক ঘাঁ, আর পুলিশে ছু’লে আঠারো ঘাঁ। তার উপর আবার চেক ডিজঅনারের কেস মানে টাকা-পয়সার খেলা। ‘ক’ এর মামলা করতে দেরী হলেও ‘খ’ কে গ্রেফতার করতে পুলিশের মোটেও্ দেরী হয়নি। অনেক কষ্টে পরিবার ও বন্ধু-বান্ধবের সহযোগিতায় টাকা ফেরৎ দিয়ে তারপর জেল থেকে মুক্তি। হায়রে সুদ! একেই বলে সুদের গ্যারাকল।

টীকাঃ- আল্লাহ-তা-আলা সুদকে হারাম করে দিয়েছেন, আর ব্যবসাকে করেছেন হালাল।

৫০০০/- টাকা নিয়ে ১০০৫০/- টাকা পরিশোধ!

সুদের গ্যারাকলঃ কেস স্ট্যাডি-এক

সময়টা ২০০৫ সাল। ‘মিঃ খ’ তার বন্ধু ‘ক’ এর সহযোগিতায় ‘মিঃ গ’ এর নিকট থেকে ৫০০০/- টাকা এক মাসের কথা বলে সুদের উপর নেয়। অবশেষে ১৬ মাস সুদ টানার পর ‘ক’ তার বন্ধু ‘খ’ কে বলে, বন্ধু এক মাসের কথা ১৬ মাস সুদ দিলে, আর কত দেবে? এবার কষ্ট করে হলেও টাকাটা ফেরৎ দিয়ে দাও। ‘খ’ বলে, আমি নিরুপায়, আরো কিছুদিন সময় লাগবে। অবশেষে ‘ক’ ‘মিঃ খ’ কে বাড়ীর কোন ছোটখাট জিনিস বিক্রি করে হলেও টাকাটা পরিশোধ করার পরামর্শ দেয়। অন্যকোন উপায় না থাকায় ‘খ’ শেষ পর্যন্ত ‘ক’ এর পরামর্শে বাড়ীর এমন একটি জিনিস, যা টাকা হলে সহজেই কেনা যায় তা বিক্রি করে সুদের উপর গৃহীত টাকা পরিশোধ করে। হিসেব করে দেখা যায় ‘মিঃ খ’ সর্বসাকুল্যে পরিশোধ করেছে (৫০০০+৫০৫০) = ১০০৫০/- টাকা। যদি ঐ সময় ‘ক’ এর পরামর্শে ‘মিঃ খ’ যদি বাড়ীর ঐ জিনিসটি বিক্রি করতে রাজী না হতো তাহলে হয়তো ১৫০০০/- টাকা সুদ দিয়েও তার গৃহীত আসল ৫০০০/- টাকা পরিশোধ হতো না। যাহোক ‘ক’ এর সহযোগিতায় ‘খ’ স্বেচ্ছায় সুদের গ্যারকলে পা দিলেও অবশেষে ‘খ’ এর অনিচ্ছা স্বত্ত্বেও ‘ক’ তাকে সুদের গ্যারকল থেকে মুক্ত করেছিল।

টীকাঃ- সুদের গ্যারাকল কী জিনিস তা কেবল সেই উপলব্ধি করতে পারে যিনি সুদের উপর টাকা নিয়েছিলেন কিংবা নিয়েছেন, অন্যেরা নয়।